মতামত
অটোরিকশার জন্য আইন কোথায়?
আইনকি সবার জন্য সমান, নাকি রাস্তায় আইনও শ্রেণিভেদে চলে!
- আফছানা নূর
- প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
-
ছবি: লেখক
রাস্তায়একটা মোটরসাইকেল দেখলেই পুলিশ থামায়— লাইসেন্সআছে কি না, কাগজপত্রঠিক আছে কি না, নম্বরপ্লেটআছে কি না, ফিটনেসআছে কি না। মাথায়হেলমেট নেই? কাগজপত্র নেই মামলা একজনবাইক চালক হেলমেট ছাড়া রাস্তায় বের হলেই আইন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়—কারণ মাথার নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ।
এটাঅবশ্যই দরকার।
কিন্তু তখনই আরেকটা প্রশ্ন মাথায় আসে— প্রতিদিনহাজার হাজার অটোরিকশা চালক যখন রাস্তায় যাত্রী নিয়ে চলেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা আছে?
অটোরিকশারধরন অনুযায়ী নিরাপত্তা বিধি ভিন্ন হতে পারে—এটা ঠিক। কিন্তু চালকের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস এবং যাত্রীর নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে কি পরিষ্কার ওকার্যকর বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়? একজনবাইক চালকের মাথায় হেলমেট না থাকলে মামলাহয়। কিন্তুঅটোরিকশা চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না, গাড়িটিরসরকারি নিবন্ধন আছে কি না, নম্বরপ্লেটআছে কি না, ফিটনেসপরীক্ষা হয়েছে কি না—এসবনিয়ে কেন এত অস্পষ্টতা?কেনকোন আইন নেই? বাংলাদেশেরসড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এ ড্রাইভিং লাইসেন্সছাড়া পাবলিক প্লেসে মোটরযান চালানো এবং রেজিস্ট্রেশন ছাড়া মোটরযান চালানোর ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
তাহলেপ্রশ্ন— আইনযদি থাকে, প্রয়োগ কোথায়? একজনবাইক চালকের জন্য হেলমেট বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে যদি রাষ্ট্র এতটা কঠোর হতে পারে, তাহলে যাত্রী বহনকারী অটোরিকশার চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তারজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা মানদণ্ডও কেন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে না? আমি অটোরিকশা বন্ধ করার কথা বলছি না।বরং আইন প্রয়োগ এর কথা বলছি। অটোরিকশাকে আইনের আওতায় আনার কথা বলছি। চলাচলএর রুট নিয়ে কথা বলছি। অটোরিকশাচলুক— কিন্তু বৈধ রেজিস্ট্রেশন নিয়ে। চালক গাড়ি চালাক— কিন্তু বৈধ লাইসেন্স নিয়ে। গাড়িরাস্তায় নামুক—কিন্তু নির্ধারিত ফিটনেস ও নিরাপত্তা পরীক্ষার পর। গাড়িতে নম্বর প্লেট থাকুক— যাতে দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটলে গাড়ি ও মালিককে শনাক্ত করা যায়। আর চালকের জন্য তার যানবাহনের ধরন অনুযায়ী স্পষ্ট নিরাপত্তা বিধি থাকুক।
একজন বাইক চালককে হেলমেটের জন্য থামানো হয় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মামলা দেওয়া হয় সেটা যদি আইনের প্রয়োগ হয়, তাহলে অন্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও যে নিরাপত্তাবিধি প্রযোজ্য, তা সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক।
আরেকটাবিষয়— রাস্তার অর্ধেক দখল করে যেখানে-সেখানে অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকা কি স্বাভাবিক? একজন গাড়িচালক বাইক চালক ভুল জায়গায় পার্কিং করলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।পুলিশ অনেক সময় অটো মামলা দেও কাগজ পত্র নিয়ে যায়। অনেক সময় ত গাড়ি ওউঠিয়ে নিয়ে যেতেও দেখি। তাহলে অটোরিকশার জন্য কেন নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থাকবে না? কেন যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে না?
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সড়কে চলাচলকারী মোটরযানের জন্য নিবন্ধন, চালকের বৈধ লাইসেন্স এবং যানবাহনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনি শর্ত রয়েছে। দেশ ভেদে নিয়ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু জনসাধারণের রাস্তা—তাই কোনো কাগজপত্র লাগবে না—এমন নীতি আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক নিয়ম নয়।
তাহলেবাংলাদেশে প্রশ্নটা খুব সাধারণ— একই রাস্তায় চলা যানবাহনের জন্য আইনের প্রয়োগ এত আলাদা কেন? একজন মোটর সাইকেল চালককে লাইসেন্সের জন্য নিয়ম মানতে হয়। একজন গাড়ির মালিককে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। বাস-ট্রাককে ফিটনেস করতে হয়। ট্যাক্স-টোকেন নবায়ন করতে হয়। নম্বর প্লেট থাকতে হয়। মোটার সাইকেল চালক ও বহনকারী ব্যক্তির হেলমেটনা থাকলে বাইক চালককে মামলা দেওয়া হয়। তাহলে অটোরিকশার ক্ষেত্রে কেন একটি স্বচ্ছ, সহজ, বাস্তবসম্মত এবং বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে না? গরিব মানুষের যানবাহন বলে আইন থেকে ছাড় দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আবারএমন নিয়ম করাও ঠিক নয়, যার খরচ বহন করতে গিয়ে দরিদ্র চালকের জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়।
সমাধানহলো— সহজ লাইসেন্স ব্যবস্থা। কমখরচে নিবন্ধন। সরকারি নম্বর প্লেট। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা। চালকের প্রশিক্ষণ। যানবাহনের ধরন অনুযায়ী নিরাপত্তা বিধি। নির্দিষ্ট রুট। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড এবং সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ।
সরকারের কাছে তাই প্রশ্ন— অটোরিকশা যদি দেশের পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে তাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কবে হবে? আর যদি আইন সবার জন্য সমান হয়— তাহলে রাস্তার প্রতিটি বৈধ যানবাহনের পরিচয়, চালকের বৈধতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে না? আমরা অটোরিকশা বন্ধ চাই না। আমরা চাই অটোরিকশাও আইন মেনে চলুক। কারণ— রাস্তা সবার। নিরাপত্তা সবার। আইনও সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
লেখক: সমাজ চিন্তক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন