অটিজম, চ্যালেঞ্জিং বিহেভিয়ার; আমাদের করণীয়
- রায়হান খান
- প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
-
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর চ্যালেঞ্জিং আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি যোগাযোগের একটি ভাষা। সেই ভাষা বুঝতে পারাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব।
অটিজম কী?
অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (Autism Spectrum Disorder) একটি স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা, যা মানুষের যোগাযোগ (Communication), সামাজিক মিথস্ক্রিয়া (Social Interaction) ও আচরণের (Behavior) ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। এখানে ‘স্পেকট্রাম’ (Spectrum) বলতে বৈচিত্র্য বোঝানো হয়। অর্থাৎ, প্রতিটি শিশুর চ্যালেঞ্জের ধরন যেমন আলাদা, তেমনি তাদের সক্ষমতা, পারদর্শিতা ও দক্ষতার ধরনও ভিন্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ দক্ষতা অন্য শিশুদের তুলনায় বেশিও হতে পারে। যেমন- অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো কোনো শিশুর স্মৃতিশক্তি, গাণিতিক দক্ষতা বা চিত্রাঙ্কনে অসাধারণ পারদর্শিতা দেখা যায়।
অটিজমের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
অটিজম, চ্যালেঞ্জিং বিহেভিয়ার; আমাদের করণীয়
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো শিশুর মধ্যে নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া কিংবা সাড়া দিতে দেরি করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে অসুবিধা, বয়স অনুযায়ী ভাষার বিকাশে দেরি, নির্দিষ্ট বিষয়ে কথোপকথন শুরু বা চালিয়ে যেতে সমস্যা, একই শব্দ বা বাক্য বারবার বলা, নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগ এবং অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগের ঘাটতি কিংবা দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এলে অস্বস্তি- এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ, আলো, গন্ধ, স্পর্শ কিংবা ভিড়ের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা অথবা তুলনামূলক কম প্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। তবে এসব বৈশিষ্ট্য সব শিশুর মধ্যে একইভাবে প্রকাশ পায় না। একটি বা দুটি লক্ষণ দেখেই কোনো শিশুকে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে শনাক্ত করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন (Assessment), সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পরামর্শ, পর্যবেক্ষণ ও যথাযথ সহায়তা।
Applied Behavior Analysis-এর ভূমিকা
অ্যাপ্লায়েড বিহেভিয়ার অ্যানালাইসিস বা Applied Behavior Analysis (ABA) সাধারণত পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের ভিত্তিতে আচরণের কারণ বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখাতে সহায়তা করে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর চ্যালেঞ্জিং আচরণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু নির্দিষ্ট আচরণটি থামানোর চেষ্টা করলেই হয় না; এর পরিবর্তে শিশুকে গ্রহণযোগ্য বিকল্প আচরণও শেখাতে হয়। যেমন- শিশুর বিরতির প্রয়োজন হলে চিৎকার করার পরিবর্তে ছবি (Picture Card), ইশারা (Gesture) বা শব্দের মাধ্যমে ‘বিরতি চাই’ বলতে শেখানো যেতে পারে।
আচরণকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও বোঝার জন্য এবিসি (ABC) পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো শিশুর চ্যালেঞ্জিং আচরণ সম্পর্কে জানতে প্রথমে সেই আচরণের ঠিক আগে কী ঘটেছিল, অর্থাৎ পূর্ববর্তী ঘটনা (Antecedent), তা জানা জরুরি। এরপর দেখতে হবে আচরণ (Behavior)- শিশুটি দৃশ্যমানভাবে কী করেছিল। সবশেষে দেখতে হবে পরিণতি (Consequence)- আচরণটির পরে কী ঘটেছিল।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আনায়ার শিক্ষক তাকে একটি অঙ্ক সমাধান করতে দিলেন। কিন্তু আনায়া অঙ্কটি সমাধান না করে খাতা ছুড়ে ফেলল। এরপর শিক্ষক তাকে আর অঙ্কটি করতে বললেন না। এ ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটলে আনায়া শিখে যেতে পারে যে কঠিন বা অপছন্দের কাজ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য খাতা ছুড়ে ফেললেই কাজটি আর করতে হবে না। ফলে ভবিষ্যতেও সে একই ধরনের আচরণ করতে পারে। তাই কোনো শিশুর নির্দিষ্ট আচরণ বিশ্লেষণ করে তার পেছনের কারণ জানা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন শিশুর আচরণ সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত তাৎক্ষণিক তথ্য (Real-Time Data) সংগ্রহ করা। এতে জানা যায়, আচরণটি কখন, কোথায়, কতবার, কতক্ষণ এবং কোন পরিস্থিতিতে ঘটছে।
সঠিক প্রমাণভিত্তিক অনুশীলন
প্রমাণভিত্তিক অনুশীলন (Evidence-Based Practices) বলতে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের শেখানোর জন্য গবেষণায় কার্যকর বলে প্রমাণিত বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিগুলোকে বোঝায়। তবে শিশুর বয়স, যোগাযোগের সক্ষমতা, আচরণের কারণ, পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, পারিবারিক অবস্থা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ বিবেচনা করে তার জন্য উপযুক্ত প্রমাণভিত্তিক অনুশীলন নির্বাচন করতে হবে।
দৃশ্যমান সময়সূচি (Visual Schedule), ইতিবাচক উৎসাহ বা শক্তিবৃদ্ধি (Positive Reinforcement), বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা (Alternative Communication), কাজকে ছোট ছোট ধাপে শেখানো, সামাজিক দক্ষতার অনুশীলন (Social Skills Practice) কিংবা পরিবেশগত পরিবর্তন (Environmental Modification)- প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে ইন্টারনেটে কোনো পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুর দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সাফল্যের জন্য মা-বাবা, শিক্ষক, থেরাপিস্ট এবং বিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
লেখক: রায়হান খান, পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি, প্রতিষ্ঠাতা, স্পেকট্রাম নার্চারিং একাডেমি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন