আবাসন খাতে হাহাকার: কীভাবে বাঁচবে ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতারা
- অমিত চক্রবর্ত্তী
- প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
-
নিজের মাথার ওপর একটা ছাদ- বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি এবং মৌলিক চাহিদাও বটে। সারা জীবনের সঞ্চয়, পেনশন আর ব্যাংকের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে মানুষ একটি ফ্ল্যাট কেনার সাহস দেখায়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই স্বপ্ন যেন এক দূরবর্তী অলীক কল্পনায় পরিণত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির কষাঘাত, নির্মাণসামগ্রীর আকাশচুম্বী দাম, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা শুধু ক্রেতাদেরই দিশাহারা করেনি, একই সঙ্গে এই খাতের সাথে জড়িত লাখ লাখ আবাসন ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের ভবিষ্যৎকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর চড়া দাম ও বিক্রিতে ধস আবাসন খাতের সাথে রড, সিমেন্ট, ইট, গ্লাস, টাইলসসহ প্রায় ২৬০টির বেশি সংযোগকারী শিল্প (Backward Linkage Industries) প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। রিহ্যাব ও সংশ্লিষ্ট বাজার বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি: প্রতি টন রডের দাম ৬০-৬৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯০-৯৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। সিমেন্ট, পাথর ও বালুর দাম বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ।
ফ্ল্যাটের দাম ও বিক্রি: সামগ্রিক নির্মাণ খরচ ৩০-৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের দাম গড়ে ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গত এক থেকে দেড় বছরে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ। মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ ও মধ্যবিত্তের পিছু হটা দেশে বর্তমানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধি: আগে যেখানে ব্যাংকগুলো আবাসন ঋণে ৯ শতাংশ বা তার কম সুদ নিত, বর্তমানে তা বেড়ে ১৩-১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
অর্থনৈতিক চাপ: একজন মধ্যবিত্তের জন্য মাসের সংসার খরচ চালিয়ে বিশাল অঙ্কের ডিপিএস বা বর্ধিত ঋণের কিস্তি শোধ করা এখন গাণিতিকভাবেই প্রায় অসম্ভব। ক্রেতা সংকটের কারণে অনেক মধ্যবিত্ত বুকিং মানি দিয়েও কিস্তি চালাতে না পেরে বিনিয়োগ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিপন্ন অর্থনীতি, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের হাহাকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) আবাসন খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। এই খাতের ওপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। বিক্রি তলানিতে ঠেকায় ছোট ও মাঝারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প শেষ করতে পারছে না। প্রায় ৩০ শতাংশ ডেভেলপার কোম্পানি ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই খাতে কর্মরত প্রকৌশলী, স্থপতি এবং দৈনিক চুক্তিতে কাজ করা লাখ লাখ নির্মাণ শ্রমিকের ওপর। কাজ হারিয়ে বা নিয়মিত বেতন না পেয়ে বিপুল সংখ্যক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সংকট উত্তরণে আধুনিক অর্থায়ন ও করণীয় আবাসন খাতকে বাঁচাতে এবং মধ্যবিত্তের স্বপ্ন রক্ষা করতে হলে নীতি-নির্ধারকদের অবিলম্বে সনাতন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক ও কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে। REITs ও ক্রাউডফান্ডিং বাস্তবায়ন: আবাসন খাতের তারল্য সংকট কাটাতে রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REITs) এবং ক্রাউডফান্ডিং (Crowdfunding)-এর মতো আধুনিক বিনিয়োগ ও অর্থায়ন মডেলগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। এর মাধ্যমে ছোট ছোট বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় একত্রিত করে বড় আবাসন প্রকল্পে মূলধন সরবরাহ করা সম্ভব। এতে আবাসন ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণের ওপর একক নির্ভরতা কমবে এবং সাধারণ মানুষও শেয়ারের মতো ছোট পুঁজিতে রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে।
রেজিস্ট্রেশন ফি হ্রাস: বর্তমানে বাংলাদেশে ফ্ল্যাট কেনাবেচায় রেজিস্ট্রেশন ফি, ভ্যাট ও অন্যান্য কর মিলিয়ে প্রায় ১০-১২.৫ শতাংশ খরচ হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। সাধারণ ক্রেতাদের উৎসাহিত করতে এটি কমিয়ে ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনা জরুরি।
সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ: মধ্যবিত্তদের জন্য এক অঙ্কের (Single digit) সুদে এবং ২৫-৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ ফান্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (Refinancing Scheme) গঠন করা যেতে পারে।
সাশ্রয়ী আবাসন: সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে (PPP) মধ্যবিত্তদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের 'অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং' প্রকল্প হাতে নিতে হবে এবং নির্মাণসামগ্রীর বাজার কঠোর তদারকির আওতায় আনতে হবে।
দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে আবাসন খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এই খাত মুখ থুবড়ে পড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন পুরো দেশের কর্মসংস্থান ও ২৬০টি সহযোগী শিল্পখাতে পড়বে। আবাসন ব্যবসায়ী, লাখো কর্মচারীর জীবনজীবিকা এবং কোটি মধ্যবিত্তের 'একটি নিজের বাড়ি'র স্বপ্নকে ধূলিসাৎ হতে দেওয়া যায় না। আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থার আইনি অনুমোদন ও নীতিনির্ধারকদের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে এই খাত আবারও অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: আবাসন খাতের একজন অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও বিশ্লেষক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন