আইএমএফের সম্মেলন
জ্বালানীর দাম বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে
- আফছানা নূর ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
- প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
-
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাগুলোর ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়। গত ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঋণের চাপ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল।
এবারের সম্মেলনের মূল প্রেক্ষাপট হলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, উচ্চ সরকারি ঋণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
আইএমএফ ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে। তবে এই হার ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় কম। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বাড়তে থাকা ঋণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের সম্ভাব্য মন্দা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্নের আশঙ্কা বেড়েছে। এতে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এসব অভিঘাত মোকাবিলায় অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারি ঋণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
উচ্চ সরকারি ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। সম্মেলনে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল রাজস্বনীতি এবং প্রবৃদ্ধিবান্ধব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। বিশেষত যেসব দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। আলোচনায় উঠে এসেছে—
উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে এআইয়ের সম্ভাবনা। কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে প্রযুক্তির প্রভাব।
আর্থিক খাতে সাইবার নিরাপত্তা ও নতুন ধরনের ঝুঁকি। দরিদ্র দেশগুলো যাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল থেকে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তা
১৭ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির বিবৃতিতে যুদ্ধ ও উচ্চ জ্বালানি মূল্যের অভিঘাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সংকটে পড়া দেশগুলোকে আরও সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই ঋণব্যবস্থা, কাঠামোগত সংস্কার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্মেলনের গুরুত্ব
বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে সম্মেলনের আলোচনাগুলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। এগুলো সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য প্রভাব; বাংলাদেশের জন্য কোনো নতুন অর্থায়ন বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ঘোষণার দাবি নয়।
ক্ষেত্র বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রভাব জ্বালানি ব্যয় আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। বৈদেশিক ঋণ আন্তর্জাতিক সুদের হার ও অর্থায়নের শর্ত কঠিন হলে ঋণ পরিশোধ ও নতুন ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়তে পারে। রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিনির্ভর শিল্পে চাহিদার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা এআই, ডিজিটাল দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা, জ্বালানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মেলনের প্রাথমিক ফলাফল ও মূল্যায়ন
১৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনের অন্যতম প্রধান বার্তা হলো—বৈশ্বিক অর্থনীতি একাধিক সংকটের সম্মুখীন এবং এসব সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়:
অর্থনৈতিক ঝুঁকি এখনো উচ্চ: প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা উন্নত হলেও যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ: আর্থিক সংকটে থাকা দেশগুলোকে সহায়তার পাশাপাশি তাদের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন: এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি যেন ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর ব্যবধান আরও বাড়িয়ে না দেয়, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রয়োজন দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক নীতি
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনেছে। সম্মেলনের আলোচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর্থিক সহায়তা এবং দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা হলো, বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাত মোকাবিলায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন