যাদুকাটা-ধোপাজান-চেলা নদীর বালু উত্তোলন
বিএনপি-আওয়ামী মিলে চাঁদাবাজি ও প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট
ডিসি বললেন: রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাও জড়িত
- সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
- প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম
-
সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান-চলতি ও চেলা নদী ঘিরে বালু-পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি, ইজারাদার, প্রশাসন, পুলিশ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম, চাঁদাবাজি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় কিছু সাংবাদিকের নামও এসেছে।
তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য প্রায় ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে যাদুকাটা-১-এর ইজারাদার হিসেবে নাছির মিয়া এবং যাদুকাটা-২-এর ইজারাদার হিসেবে শাহ রুবেল আহমদের নাম এসেছে। ইজারা দেওয়ার পর নদীর নির্ধারিত অংশের বাইরে বালু উত্তোলন, নদীর তীর কেটে বালু নেওয়া এবং ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে কয়েকটি গ্রাম, সড়ক ও সরকারি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। যাদুকাটা নদীর দুই বালুমহাল প্রায় ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল এবং নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের কারণে আশপাশের এলাকা হুমকিতে পড়েছে।
২০২৬ সালেও যাদুকাটায় ড্রেজার ব্যবহার ও নদীর তীর কাটার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে ইজারাদারদের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে—তাঁদের দাবি, তাঁরা নির্ধারিত এলাকার মধ্য থেকেই বালু উত্তোলন করছেন এবং নদীর তীর কাটা বন্ধে প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন।
রিট, ইজারা ও রাজস্বের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
যাদুকাটা-১ ও ২-এর ইজারা এবং পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা ও রিট হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও যাদুকাটা-১ ও ২ থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিটে শাহ রুবেল আহমদ ও নাছির মিয়াসহ সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষভুক্ত করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় ইজারার মেয়াদ, আদালতের আদেশ, প্রশাসনের দখল হস্তান্তর এবং ইজারাদারদের বালু উত্তোলনের অধিকার—এই চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ আদালতের আদেশের বাইরে গিয়ে উত্তোলন করা হলে তা থেকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিরও আশঙ্কা থাকে।
ধোপাজান: ইজারা বন্ধ, তবুও উত্তোলনের অভিযোগ
সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধোপাজান-চলতি নদী নিয়ে অভিযোগ আরও পুরোনো। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, পরিবেশ ও নদীভাঙনের কারণে ২০১৮ সাল থেকে ধোপাজান বালুমহালের ইজারা বন্ধ রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে সেখানে অবৈধভাবে বালু-পাথর তোলা হয়। ২০২৫ সালে ধোপাজান থেকে অবাধে বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন। পরবর্তী সময়েও নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগে অভিযান ও আটকের করা হয়েছে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও ধোপাজান নদী থেকে বালু লুট এবং ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে।
চেলা নদীতেও ভাঙন ও অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ
ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী চেলা নদী নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্র ব্যবহার করে নদীর তীর থেকে বালু উত্তোলনের ফলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক ঝুঁকিতে পড়ছে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে চেলা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে ঘরবাড়ি, সড়ক ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নদীতীরবর্তী ১০-১২টি গ্রামের বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়ার অভিযোগও
রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, নদীগুলোকে কেন্দ্র করে বালু-পাথর উত্তোলনের ব্যবসায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষ করে যাদুকাটা নদীর বালুমহালকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নদী থেকে উত্তোলিত বালুর ওপর বিভিন্ন নামে অনানুষ্ঠানিক টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এই অর্থ রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রশাসন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। তবে কথিত অর্থ বণ্টনের নির্দিষ্ট অনুপাত—যেমন ৫০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ বা ৩৫ শতাংশ—স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
রাজনৈতিক যোগসাজস
বর্তমান সরকার দলীয় সংসদ সদস্য (মিলন-নুরুল-কামরুল) দলের দুর্বৃত্তদের দমন না করে নিজেই অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, কমিশন, চাঁদাবাজিসহ আওয়ামী লীগের অপরাধ জগতে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যবসা-বাণিজ্য তারা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেখবাল করছেন। প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামী কেন্দ্রীয় স্থলবন্দর লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সদস্য বালুখেকো মোঃ আজাদ হোসেনের সাথে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ব্যবসা বাণিজ্যসহ তাকে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি নিয়ে জেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সুনামগঞ্জ-০১ (তাহিরপুর, মধ্যনগর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ) কামরুজ্জামান কামরুল, এমপি, সুনামগঞ্জ-০৪ (সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর) নুরুল ইসলাম নুরুল, এমপি এবং সুনামগঞ্জ-০৫ (ছাতক, দোয়ারাবাজার) কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন এমপি ও বিএনপির প্রভাবশালী কিছু নেতাকর্মী ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনের ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে মিলেমিছে ব্যবসা, বাণিজ্য ও অবাদে চলাফেরা করেন। পুলিশী হয়রানি কিংবা নির্যাতন কিছুই তাদেরকে আর্চ করতে পারেনি। সবচেয়ে আশ্চার্য্যের বিষয় হচ্ছে তারা জেলা শহরে মিটিং মিছিল করতে চাইলে সর্বপ্রথম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুটের অনুমতি নিতেন। তখন তিনি পুলিশকে বলে দিতেন তারা (মিলন-নুরুল-কামরুল) শহরের এই জায়গায় মিটিং মিছিল করবে আপনারা কোন ধরণের ঝামেলা কিংবা বাধা প্রদান করবেন না। সমগ্র বাংলাদেশে যখন বিএনপি’র নেতাকর্মীগণ মিটিং মিছিল তো দূরের কথা নিজের ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের সাথে নিয়ে ঘুমাতে পারতেন না, সেখানে কলিম উদ্দিন মিলন ও নুরুল ইসলাম নুরুল এবং কামরুজ্জামান কামরুল ছিল ভিন্ন। তারা তিনজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে ব্যবসা, বাণিজ্য ও দলীয় সকল কার্যক্রম সারা দেশের তুলনায় অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বিএনপির অনেক ত্যাগী ও জেল জুলুম খাটা নেতাকর্মীগণ মনে করেন তারা (মিলন-নুরুল-কামরুল) বিএনপির সংসদ সদস্য হলেও, ভিতরে ভিতরে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। কারণ অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে টাকার বিনিময়ে কমিটি বাণিজ্যসহ নদীতে অবৈধ বালু, পাথর উত্তোলন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মামলা বাণিজ্য, মাদক ও চোরাচালান এবং জল ও বালুমহালের মাধ্যমে তারা তিনজন খুব অল্পসময়ে শত শত কোটি টাকার মালিন বনে যান। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরে আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাকর্মীগণ বিদেশ পলায়নসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকলে তাদের সকল ব্যবসা-বাণিজ্যের সকল কার্যক্রম বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তিন এমপি মিলন-নুরুল-কামরুল। উক্ত ব্যবসার লাভের টাকা গোপনে আওয়ামী লীগ নেতাদের গোপন একাউন্টে ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে থাকেন।
উল্লেখ্য যে, ০৫ই আগস্ট ২০২৪ পরবর্তীতে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও নুরুল ইসলাম নুরুল এবং কামরুজ্জামান কামরুল এর চাঁদাবাজীর কারনে জেলায় বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। তাছাড়া উক্ত তিনজন এমপি জেলার বেশিরভাগ ছিনতাইকারী, কিশোর অপরাধীকে আশ্রয় প্রদান, সীমান্তের চোরাচালান নিয়ন্ত্রন, ভারতীয় গরু চোরাচালান হতে চাঁদা গ্রহন, মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় প্রদান করেন। তারা থানায় মামলা রুজুতে অবৈধ তদবির ও জুনিয়র পুলিশ সদস্যদের পোস্টিংয়ে তদবির করে জেলা পুলিশের চেইন অব কমান্ডে ব্যাঘাত ঘটানোসহ পুলিশের আইনী কর্মকান্ডে বাধাঁর সৃষ্টি করে। জেলা পুলিশ ও বিএনপি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন। এছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি মিলন-নুরুল-কামরুল বাহিনী দমন-পীড়নের অপসংস্কৃতির রাজনীতি চর্চা করছে।
এছাড়া ফ্যাসিস্টের ধূসর ও বালুখেকো মোঃ আজাদ হোসেন বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাদুকাটা নদী দুই বছর মেয়াদের একটি লিজ আনেন। তখন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরাসরি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের লিজ বাতিলপূর্বক পরিবেশের দিক বিবেচনা করে উক্ত লিজ বাতিল করেন এবং জেলা প্রশাসক নিজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে লিজ দেন। উক্ত ঘটনায় আজাদ হোসেন উচ্চ আদালতে একটি মামলা করেন। বর্তমানে বিগত সরকারের দায়েরকৃত মামলাটি পুনরায় চালু করার জন্য আজাদ হোসেনকে সাহায্য সহযোগিতা করছেন উক্ত তিনজন সংসদ সদস্য। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে উক্ত বিষয়টি সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রয়া দেখা গেছে। সুনামগঞ্জের চিহ্নিত বালুখেকো ও বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মো: আজাদ হোসেন সাথে উক্ত তিনজন এমপির গভীর সখ্যতা রয়েছে। তারা মিলেমিশে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছর মো. আজাদ হোসেন এক চেটিয়াভাবে যাদুকাটা নদী ভোগদখল করেন। যার ফলে রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সমর্থিত তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়ন এর ‘চেয়ারম্যান নির্বাচন হোন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাসহ কয়েক ডজন মামলার আসামি মো. আজাদ হোসেন বর্তমান সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। উক্ত ফ্যাসিস্টের ধূসর মো: আজাদ হোসেন এর নিকট হতে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সরকারদলীয় এমপি এবং বিএনপির কিছু প্রভাবশালীনেতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরাপদ আশ্রয় ও সহযোগিতা দিচ্ছেন বলে জানা যায়। নাশকতামূলক কর্মকান্ডে জড়িত আজাদ হোসেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকারের জন্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
নদী থেকে চাঁদা আদায় ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে একজন স্থানীয় সাংবাদিক হাবিব সরোয়ার আযাদ, তার ছেলে শিপুর বিরুদ্ধে যাদুকাটায় ড্রেজার পরিচালনা এবং টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ সুপারের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নদীগুলোতে অবৈধ উত্তোলন ও চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসন ও পুলিশের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁদের সুযোগ করে দিয়েছেন। তবে একই সময়ে প্রশাসনের অভিযান, বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা, মোবাইল কোর্ট এবং অবৈধ উত্তোলনকারীদের আটকের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে কোন সময়ে কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, কোথায় কতটি অভিযান হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে এবং কী পরিমাণ বালু জব্দ হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। চ
পরিবেশগত ক্ষতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
বালু উত্তোলনের সঙ্গে রাজস্বের প্রশ্ন থাকলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নদী ও নদীতীরবর্তী মানুষের ওপর। যাদুকাটায় নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ফলে গ্রাম, সড়ক ও সরকারি জমি ঝুঁকিতে পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে ধোপাজান নদীতে দীর্ঘদিনের অবৈধ উত্তোলনের কারণে নদীতীরবর্তী জনপদ ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পরিবেশ আইনবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি—বেলা—২০২৫ সালে ধোপাজান নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের চিঠি
কোথায় কত টাকা—স্বাধীন তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিন নদী থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বালু উত্তোলন ও অনানুষ্ঠানিক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কোনো কোনো পক্ষের দাবি, যাদুকাটা থেকে দৈনিক ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হয়। তবে এই অর্থের পরিমাণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য হিসাব বা সরকারি নথি পাওয়া যায়নি।
দুদক ও বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের দাবি
যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু উত্তোলনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো একই সঙ্গে রাজস্ব, পরিবেশ, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, নথি ও আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বালুমহালের ইজারা মূল্য, প্রকৃত উত্তোলন, রাজস্ব আদায়, কথিত চাঁদার পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না—তা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু উত্তোলন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হোক।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
বালু তোলায় অনিয়ম বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, বালু মহাল থেকে বালু তোলার সময় সীমা বৃদ্ধির জন্য নাছির ও রুবেল নামে দুজন ব্যবসায়ী হাইকোর্টে রিট করেন। আমাদের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ঢাকায় অ্যাটর্নী জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটার আইনী মোকাবেলা করেন। বালু তোলায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে মিটিং করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। তাদের স্টে অর্ডার শেষ হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে তাহিয়া স্ট্রোন ক্রাশারের নাছিরকে ২২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় একটি স্মারকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ইজারাদার হিসেবে ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য যাদুকাটা নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমেদ। আদালত মন্ত্রণালয়ের সেই স্মারক বা আদেশের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ জারি করেন।
ডিসি বলেন, আমাদের পরবর্তী করণীয় নিয়ে গত ১ তারিখ জেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভা হওয়ার কথা। কিন্তু ভূমি মন্ত্রনালয় থেকে আমরা কোন নির্দেশনা পাইনি। আমরা ভূমি মন্ত্রী ও ভূমি সচিব মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। যাদুকাটার বালু মহালে বালু তোলা নিয়ে অনেক বড় বড় গ্রুপ জড়িত উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, নাছির ও রুবেল আগে একই গ্রুপে ছিল। এখন তারা আলদা গ্রুপ। তাহিয়া স্ট্রোন ক্রাশারের নাছির সুমানগঞ্জ-১ আসনের এমপির সঙ্গে মিলে কাজ করেন, আর জিনান এন্টারপ্রাইজের রুবেল আহমেদ কাজ করেন সুমানগঞ্জ-৪ আসনের এমপির হয়ে। বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অপেক্ষায় আছি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন