কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি
চেয়ারম্যান জাকিয়ার উদাসীনতায় ৬৭৮১ কোটি বিদেশিদের পকেটে
# সিইওর মাসিক পৌনে ৪ লাখ ভোগ করেন জাকিয়া # ইচ্ছামতো ভেঙেছেন সিএসআর ফান্ড # বিধি না মেনে স্বজনদের দেন চাকরি # ক্ষোভ থেকে ইঞ্জিনিয়ার বদলি # পাসপোর্ট বাতিল, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
- বিশেষ প্রতিনিধি
- প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
-
জাকিয়া সুলতানা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক সিনিয়র সচিব। ক্ষমতাচ্যূত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এই আমলাকে গত ২০ ফেব্রুয়ারি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পাানি লিমিটেডে (কাফকো) পদাধিকারবলে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাফেকোতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন তিনি। জাকিয়া এবং তার আগের চারজন শিল্প সচিবের মদদে কাফকোর পৌনে ৭ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে নিয়ে গেছে বিদেশি বিনিয়োগকারী চার প্রতিষ্ঠান। অনৈতিক সুবিধা নিয়েই তারা দেশের এ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে চলে যেতে সাহায্য করেছেন তারা। এ সংক্রান্ত সকল প্রমাণপত্র রয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগই তিনি অস্বীকার করেছেন।
কাফকোর ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা জানান, অন্যায়ভাবে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বদলি, অনিয়মের মাধ্যমে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিট বা সিএসআর ফাণ্ড আত্মসাৎ, জুম মিটিংয়ের জন্য অস্বাভাবিক সম্মানী গ্রহণ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ না দিয়েই নিজেই সেই পদের বেতন-ভাতা ভোগসহ নানা অনিয়ম করেছেন জাকিয়া সুলতানা।
জানা গেছে, ২০২১ সালের মে মাসে শিল্প মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়েই একের পর এক অনিয়মে জড়ান জাকিয়া। বাংলাদেশ সরকার ও বিদেশি মালিকানায় পরিচালিত কাফকোতে চেয়ারম্যান পদের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সিইওর দায়িত্বও নেন তিনি। অথচ সিইও নিয়োগ দিতে কাফকোর বোর্ড মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলেও তিনি তা বাস্তবায়ন করেননি। সিইওর বেতনের পৌনে ৪ লাখ টাকা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ভোগ করার উদ্দেশ্যেই জাকিয়া বোর্ড মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটেননি। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা তার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলেননি। কারণ তার স্বামী পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলামের ভয় দেখিয়ে সবার মুখ বন্ধ রাখতেন তিনি। আতিকুল জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের অপারেশনাল প্রধান হিসেবে গণহত্যার নির্দেশ বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে অন্যতম। হাসিনার পতনের পর চাকরিচ্যূত হন আতিকুল। পরে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে তার বিচার চলছে। অথচ নানা অনিয়ম ও ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী সচিব হিসেবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন আতিকুলের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার পাসপোর্ট বাতিল করে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার।
৬৭৮১ কোটি টাকা বিদেশিদের পকেটে:
কাফকো বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে গ্যাস, অবৈধ শুল্কছাড় এবং নিম্ন আয়কর (৫০%) সুবিধায় পেয়ে আসছে। অথচ এটি বাংলাদেশের আইনের পরিপন্থি। এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় একাধিকবার আপত্তি জানালে এসব সুবিধা বন্ধ করা যায়নি। সরকারি সুবিধা নিয়ে মুনাফা করার পর সে টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পকেটে। তাদেরকে এ সুবিধা দিতে তৎপর থাকেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিসিআইসির চেয়ারম্যানরা। ডিভিডেন্টের নামে ২০১২ সালের জুন থেকে গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা নিয়ে গেছে বিদেশি বিনিয়োগকারী চার প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে মারুবেনী ও চিয়োদা ৩ হাজার ৬৯৩ কোটি, সাইফা ও টপশো ১ হাজার ৭১৪ কোটি, আই.এফ ইউ ১ হাজার ১৮৯ কোটি এবং স্টেমিকার বন ১৮৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার নামমাত্র মূল্যে গ্যাস, শুল্কছাড় এবং নিম্ন আয়কর (৫০%) সুবিধা না দিলে লাভের মুখ দেখতো না কাফকো। এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দেশের টাকা লুটে নেওয়ার সুযোগ পেত না। সরকারের এ সুবিধা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কাফকোর তথ্য উপাত্ত বলছে, সাবেক শিল্প সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, সাবেক সিনিয়র সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মো. আব্দুল হালিম, কে এম আলী আজম এবং সর্বশেষ জাকিয়া সুলতানা কাফকোর চেয়ারম্যান থাকাকালে বিদেশি বিনিয়োগকারীর প্রতিষ্ঠানটির লভ্যাংশ নিয়ে যায়। অথচ সরকার নামমাত্র মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করে আসছে। তাদের কাছে ব্যাখা চাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকার প্রায় ৫০ শতাংশ কমমূল্যে কাফকোকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি সুবিধা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার সুবিধা পাচ্ছে। নামমাত্র মূল্যে দেশের গ্যাস ও জ্বালানিতে মুনাফাও হলেও সেটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে চলে যাচ্ছে। এই মুনাফা ডলারে পাঠানো হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকে ডলার সংকট চলছে। কিন্তু সদ্য সাবেক শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা ও তার আগে আরও তিন সচিবের যোগসাজশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বিনিময়ে শিল্প সচিবরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নেন।
এ প্রসঙ্গে সাবেক শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা কালবেলাকে বলেন, কাফকো একটি বহুজাতিক কোম্পানি। এটার সুনির্দিষ্ট আইন আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন এত টাকা নিয়ে গেল সেটি আমি জানি না।
খনিজ সম্পদের বকেয়া ২২০০ কোটি:
সরকারের কাছ থেকে কমমূল্যে গ্যাস নিয়ে মুনাফার পর সেই টাকা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে চলে গেলে বকেয়া রয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। জাকিয়া সুলতানার গড়িমসির কারণে কাফকো এ টাকা পরিশোধ করেনি।
কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড থেকে কাফকোকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্যহার শিল্প শ্রেণির জন্য নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু কাফকো পূর্ববর্তী মূল্যহার প্রতি ঘনমিটার মাত্র ১৪ টাকা করে পরিশোধ করে আসছে। ফলে মূল্যহার বাড়ানোর পর থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের কাছে কাফকোর বকেয়া পড়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কাফকোর চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে এ বকেয়া পরিশোধের কোনো উদ্যোগই নেননি জাকিয়া।
জাকিয়ার গাড়ি বিলাস:
নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তিনি কাফকোর দুটি গাড়ি নিজের দখলে রাখেন। গাড়ির ড্রাইভার, তেল ও রক্ষণাবেক্ষণসহ সমস্ত খরচই তিনি কাফকো থেকে মেটাতেন। অথচ শিল্প সচিব হিসেবেও তিনি মন্ত্রণালয়ের গাড়ি ব্যবহার করতেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে গাড়ি বিলাসী পরিবার গড়ে তোলেন জাকিয়া। কাফকো থেকে নেওয়া গাড়ির একটি তার মেয়ে নিয়মিত ব্যবহার করতেন। পাজেরো গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্টো ঘ-১১-৯০৯৭ এবং দুই কোটি টাকা দামের ঢাকা মেট্টো ঘ-১৫-৪০২৯ ল্যান্ড ক্রুজার।
দুটি গাড়ি ব্যবহারের বিষয় অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি কখনোই দুটি গাড়ি ব্যবহার করিনি। আমি একটি কাফকোর একটি গাড়িই ব্যবহার করেছি। মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে আমি গাড়ি নেইনি। তবে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে তিনি কাফকোর দুটি গাড়ি ব্যবহার করতেন।
ইচ্ছামতো সিএসআর ফান্ড ব্যায়
কাফকোর চেয়ারম্যান হওয়ার পর সিএসআর ফান্ড থেকে নামে-বেনামে ২ কোটি ৪১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন তিনি। এ টাকার বেশিরভাগই তার নিজ জেলা নাটোরে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিতরণ করেন। নাটোরের শিঙ্গগ্রা বাজারে দুই দফায় ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, নাটোর সুগার মিলে ২২ লাখ টাকা এবং শিঙ্গগ্রা চলন বিল স্কুলে ২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বিতরণ করেন জাকিয়া। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের জেলাতে দফায় দফায় সিএসআর ফান্ড থেকে টাকা দেওয়াকে ভালোভাবে নেননি কর্মকর্তারা। এছাড়া তার পুলিশ স্বামীর অনুরোধে বাংলাদেশ মহিলা পুলিশের জন্য তিনি দুই দফায় সাড়ে ৬ লাখ টাকারও বেশি অনুদান তিনি দেন। সিএসআর ফান্ড অপব্যবহারের সকল তথ্যই কালবেলার হাতে রয়েছে।
জাকিয়া সুলতানা বলেন, সিএসআর ফান্ডের টাকা সব সময় খেলাধূলা কিংবা অন্য কাজে ব্যবহার করা হতো। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করেছি। নিজের জেলা নাটোরে বেশি পরিমাণে বিতরণ করার বিষয়টিও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
জুম মিটিংয়েও অস্বাভাবিক সম্মানি :
কাফকোর জুম মিটিংয়ের জন্যও অস্বাভাবিক সম্মানি নিতেন জাকিয়া সুলতানা। শিল্প মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর বিভিন্ন সময় শুধুমাত্র মিটিং বাবদই কাফকো থেকে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৬ টাকা নিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, জাকিয়া সুলতানা স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে সিনিয়র সচিবের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন শিল্প মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয় ও কাফকোর কয়েকজন কর্মচারীকে নিজের বাসায় কাজ করাতেন জাকিয়া সুলতানা। এটি পুরোপুরি চাকরিবিধি লঙ্ঘন। তবুও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্মচারীদের নিজের ইচ্ছেমতো কাজে খাটাতেন। এ নিয়ে কর্মকর্তারা ক্ষোভে ফুসলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলেননি।
অন্যায়ভাবে চার ইঞ্জিনিয়ারকে বদলি :
কাফকোর সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ও সিইও জাকিয়া সুলতানা ক্ষমতার অপব্যবহার করে চারজন ইঞ্জিনিয়ারকে প্ল্যান্ট থেকে ঢাকা হেড অফিসে বদলি করেন। এসব ইঞ্জিনিয়ারদের তিনি বিক্রয় ও মানবসম্পদ বিভাগে বদলি করে কাফকোর বড় ধরনের ক্ষতি করেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই তিনি তাদেরকে বদলি করেন।
অন্যায়ভাবে বদলিকৃতরা হলেন- প্ল্যান্টের মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার এস.এম.এ কাশেম, প্ল্যান্টের প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, ওয়্যারহাউস কর্মকর্তা আব্দুর রউফ এবং ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের এসকে মো. লুৎফর রহমান।
জাকিয়া সুলতানা বলেন, বদলি আমি করিনি। নিয়োগ বদলির কাজটি করে প্রশাসন। আমি কাউকে বদলি করার দায়িত্ব নেইনি।
অন্যদিকে তার বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কাফকোতে চাকরি দিয়েছেন জাকিয়া সুলতানা। চাকরি পাওয়া তার স্বজনদের নাম জানা গেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন