সৌদির দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নেটিজনদের ক্ষোভ
আমরা কি আসলে আইনের শাসন চাই নাকি আবেগের বহিঃপ্রকাশ?
- আফছানা নূর
- প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
-
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আবেগপূর্ণ স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, সৌদি সরকার কেন এমন কঠোর শাস্তি দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ঘটনা তুলে ধরে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। মানুষের আবেগ, সহমর্মিতা কিংবা কোনো ঘটনার বিস্তারিত জানার আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরও করা উচিত—আমরা কি সত্যিই আইনের শাসন চাই, নাকি অপরাধের পরিণতি যখন নিজের দেশের নাগরিকের জীবনে এসে পড়ে, তখন আবেগের বশে সেই আইনের বিরোধিতা করি?
একটি রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ, তা শুধু তার আইন বই দেখে বোঝা যায় না; বোঝা যায় অপরাধীর মনে আইন কতটা ভয় সৃষ্টি করতে পেরেছে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে এবং অপরাধের শিকার মানুষ কতটা ন্যায়বিচার পাচ্ছে, তা দেখে। যে দেশে অপরাধ করেও পার পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেখানে আইন যত কঠোরই হোক, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আর যে দেশে অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে মানুষ সচেতন থাকে এবং আইন নিরপেক্ষভাবে কার্যকর হয়, সেখানে অপরাধ দমনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এর ঘোষণায় বলা হয়, ‘মক্কা অঞ্চলে একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর নাজেরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।’ তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দেয়নি। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা এ বিষয়ে অবহিত ছিল না এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো দেশের আইন আমাদের পছন্দ না হলেই সেই দেশের আইন অমান্য করার অধিকার কারও জন্মায় না। কেউ অন্য দেশে বসবাস বা কাজ করতে গেলে সেই দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলার দায়িত্ব তার। একই সঙ্গে সেই দেশের কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য বিচার এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি তাই শুধু আবেগ দিয়ে বিচার না করে আইন, দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।
অন্য দেশের আইনকে সম্মান করা কি আমাদের দায়িত্ব নয়?
সৌদি আরবের আইন ও বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো নয়। সেখানে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।বিশেষ করে তারা জেনা ব্যাভিচার এর ক্ষেত্রে অন্তত কঠিন ভাবে শরিয়া আইন প্রয়োগ করে।কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সৌদি আরবে বসবাস করলে তাঁকে সেই দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং তা মেনে চলতে হবে। আমরা যখন বিদেশে যাই, তখন সেখানকার সুযোগ-সুবিধা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশা করি। কিন্তু সেই দেশের আইন ও সামাজিক বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ এলেই যদি আমরা শুধু নিজেদের আবেগকে প্রাধান্য দিই, তাহলে তা কতটা যুক্তিসংগত?
একটি দেশের আইনকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে সেই দেশের প্রতিটি আইন বা প্রতিটি বিচারিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যাবে না। আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলা, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবি করা কিংবা মানবাধিকারের বিষয়টি উত্থাপন করা নাগরিক আলোচনার বৈধ অংশ। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণ বিবরণ না জেনে শুধু আবেগের বশে একটি দেশের বিচারব্যবস্থাকে আক্রমণ করাও যুক্তিসংগত নয়।
সৌদি আরবের এই ঘটনা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা জরুরি। বাংলাদেশ সরকারও ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগের প্রকৃত বিবরণ জানা উচিত।
আইনের কঠোরতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আইন শুধু অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই মানুষকে সতর্ক করার জন্যও। একজন ব্যক্তি যদি জানেন যে অপরাধ করলে তাঁকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, তাহলে সেই পরিণতি তাঁকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে।
এ কারণেই অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান থাকা জরুরি। আইন যদি কাগজে কঠোর থাকে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল হয়, তাহলে সেই আইনের কার্যকারিতা কমে যায়। অপরাধী যদি মনে করেন যে অর্থ, ক্ষমতা, পরিচয় কিংবা প্রভাব খাটিয়ে তিনি পার পেয়ে যাবেন, তাহলে আইন তাঁর কাছে ভয়ের কারণ না হয়ে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিধান হয়ে দাঁড়ায়।
যেটা আমরা বাংলাদেশে সচরাচর দেখি।তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—কঠোর শাস্তি একাই সব অপরাধ বন্ধ করতে পারে না। অপরাধের নির্ভরযোগ্য তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা, দ্রুত বিচার এবং আইনের সমান প্রয়োগও অপরিহার্য। শাস্তি যত কঠোরই হোক, অপরাধী যদি বিচারের আওতায়ই না আসেন, তাহলে সেই কঠোরতার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের কী শেখায়?
বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ ও নানা ধরনের সহিংসতার খবর প্রকাশিত হলে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার দাবি ওঠে, অপরাধীর কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ক্ষোভের পর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পরিবর্তন কতটা আসে?
অপরাধের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, বিচার পেতে বিলম্ব, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে। যখন মানুষ দেখে কোনো গুরুতর অপরাধের বিচার দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তখন সমাজে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
আমাদের দেশে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বলতে শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ানো বোঝালে চলবে না। বোঝাতে হবে—অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর পরিচয় বা প্রভাব তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলতে পারবে না। ধর্ষণ, নৃশংস হত্যা কিংবা অন্য গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং অপরাধীকে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমাতে হবে।
আমি মনে করি, অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দুর্বলতা সমাজে অপরাধীর সাহস বাড়াতে পারে। তাই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো আপস থাকা উচিত নয়।
তবে কঠোরতা মানেই কি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন তোলা যাবে না?
এখানেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কোনো দেশের আইনকে সম্মান করা এবং সেই দেশের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা পরস্পরবিরোধী নয়। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড এমন একটি শাস্তি, যা কার্যকর হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই অভিযোগের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ বিচার এবং আপিলের অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের দুই বাংলাদেশির ঘটনা নিয়ে আমাদের উচিত পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেওয়া এবং বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে দেওয়া। একই সঙ্গে শুধু তাঁরা বাংলাদেশি বলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যায় বলা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ঘটনার বিস্তারিত না জেনে মৃত্যুদণ্ডের প্রতিটি দিককে প্রশ্নাতীত বলাও সঠিক নয়।
আইনের শাসনের অর্থ হলো—অপরাধ করলে জবাবদিহি করতে হবে, আর বিচার করতে গেলে আইন ও ন্যায়বিচারের নীতিও মানতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন, একটি পরিবার প্রিয়জনকে নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে এবং কোনো অপরাধী ক্ষমতার জোরে আইনের হাত থেকে রক্ষা পাবেন না। আমরা এমন বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হবে, বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না এবং নিরপরাধ কেউ অন্যায়ভাবে শাস্তি পাবেন না।
সৌদি আরবের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত—বিদেশে বসবাস করলে সেই দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং আইন মেনে চলা অপরিহার্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
আমরা যদি সত্যিই খুন, ধর্ষণ ও সহিংসতামুক্ত সমাজ চাই, তাহলে অপরাধের বিরুদ্ধে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না। এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে অপরাধীর মনে শাস্তির বাস্তব আশঙ্কা থাকবে এবং ভুক্তভোগীর মনে ন্যায়বিচার পাওয়ার বিশ্বাস থাকবে।
শেষ কথা হলো, আইন দুর্বল হলে অপরাধীর সাহস বাড়তে পারে, আর আইন কার্যকর হলে অপরাধের ঝুঁকি কমে। তাই আমাদের দাবি হওয়া উচিত—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক, অপরাধীর কোনো আশ্রয় না থাকুক এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে রাষ্ট্র কোনো আপোষ না করুক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলাউদ্দিন
ঠিকানা: ৩৭/২, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
স্বত্ব © সিসিএনবিজি মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন